শুক্রবার ৩০ জানুয়ারী ২০২৬ - ১৪:০৭
আমরা এখন "ভয় দেখানো যুদ্ধের যুগে" অবস্থান করছি!!

আমরা এখন "ভয় দেখানো যুদ্ধের যুগে" অবস্থান করছি!!

আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ভূ–কৌশল ও দাজ্জালী বিশ্বব্যবস্থার বিশ্লেষণ!!

বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়—যে দেশগুলো নিজেদের পরাশক্তি বলে দাবি করে, তারাই ছিল ভয় ছড়ানোর কেন্দ্রবিন্দু।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,

রিপোর্ট: মুস্তাক আহমদ 

এক সময় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুদ্ধ মানেই ছিল রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী বনাম সেনাবাহিনী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেই কাঠামো বদলাতে শুরু করে, আর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব কার্যত ঢুকে পড়ে একক ক্ষমতার ছায়ায়। সেই সময় থেকেই যুদ্ধ ধীরে ধীরে রূপ নেয়—সরাসরি সংঘর্ষ থেকে মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণে।
২০১৯ সালের করোনা মহামারি সেই পরিবর্তিত যুদ্ধনীতির এক ঐতিহাসিক পরীক্ষাগার। বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়—যে দেশগুলো নিজেদের পরাশক্তি বলে দাবি করে, তারাই ছিল ভয় ছড়ানোর কেন্দ্রবিন্দু। আন্তর্জাতিক সংস্থা, বহুজাতিক মিডিয়া, ওষুধ কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান—সবাই একই সুরে কথা বলেছে। ভিন্নমতকে বিজ্ঞানবিরোধী, রাষ্ট্রবিরোধী কিংবা মানবতাবিরোধী বলে দমন করা হয়েছে।
ফলে প্রশ্ন ওঠে—এটি কি কেবল একটি স্বাস্থ্যসংকট ছিল, নাকি এটি ছিল গ্লোবাল গভর্নেন্স কায়েমের মহড়া?
২০১৯ সালে করোনার নামে যে লকডাউন চাপানো হলো, তা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে, ছোট দেশগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলেছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনকে রাষ্ট্রীয় ও কর্পোরেট নির্দেশনার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল করে তুলেছে। এই সময়েই আন্তর্জাতিক কর্পোরেশনগুলো আরও শক্তিশালী হয়েছে, ডিজিটাল নজরদারি স্বাভাবিক হয়ে গেছে, আর মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে।
এই ধারাবাহিকতার পরবর্তী অধ্যায় হচ্ছে ভয় দেখানো যুদ্ধনীতি—যার সাম্প্রতিক উদাহরণ ইরানকে কেন্দ্র করে আমেরিকার লাগাতার হুমকি। যুদ্ধ হবে—এই ঘোষণাই এখানে মূল অস্ত্র। বাস্তবে হামলা না করেও বিশ্ববাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করা যায়, জ্বালানি বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে কৌশলগত চাপে রাখা যায়।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটি পরিচিত Hybrid Warfare নামে—যেখানে সামরিক, অর্থনৈতিক, তথ্য ও মানসিক যুদ্ধ একসঙ্গে চালানো হয়। নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ, মিডিয়া প্রোপাগান্ডা এবং যুদ্ধের হুমকি—সব মিলিয়ে একটি রাষ্ট্রকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করা হয়।
এখানে লক্ষ্য ইরান একা নয়। লক্ষ্য হলো এমন সব রাষ্ট্র, যারা কর্পোরেট-নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার বাইরে দাঁড়িয়ে নিজস্ব আদর্শ, অর্থনীতি কিংবা রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখতে চায়। তাই ইরান, ভেনেজুয়েলা, রাশিয়া বা চীনের মতো দেশগুলো বারবার এই ভয় দেখানো যুদ্ধের নিশানা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে “দাজ্জালী ফেতনা” কোনো ধর্মীয় কল্পনা নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক ক্ষমতা-ব্যবস্থার প্রতীক। দাজ্জাল মানে এমন এক শক্তি, যা সত্যকে আড়াল করে, মিথ্যাকে উন্নয়ন বলে সাজায়, এবং ভয় দিয়ে মানুষকে বশ মানায়।
সে সরাসরি হত্যা করে না—সে মানুষকে ধীরে ধীরে নির্বোধ ও নির্ভরশীল করে তোলে।
আজকের বিশ্বে বড় বড় কারখানা, খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা, ওষুধ শিল্প, প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রবাহ—সবই অল্প কিছু কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত। রাষ্ট্রগুলো ক্রমে পরিণত হচ্ছে তাদের নিরাপত্তা প্রহরীতে। যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—এই যুদ্ধের কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নেই, কোনো যুদ্ধঘোষণা নেই, কোনো শান্তিচুক্তিও নেই। যুদ্ধটা চলছে মানুষের মনে, মানুষের মানসিকতায়।
তাই এই যুগে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দায়িত্ব হলো ভয়ের রাজনীতি চিনে ফেলা। যে মুহূর্তে মানুষ ভয়কে প্রশ্ন করতে শিখবে, সেই মুহূর্তেই এই নীরব যুদ্ধ দুর্বল হতে শুরু করবে।
কারণ ইতিহাস সাক্ষী—
যে শক্তি ভয় দিয়ে শাসন করে,
সেই শক্তি একদিন সাহসের কাছেই পরাজিত হয়।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha